×

এই নাহলে ভালোবাসার টান, মোটা বেতনের চাকরি ছেড়ে কেশবপুরে এসে কৃষিকাজে মগ্ন মার্কিন ইঞ্জিনিয়ার

কেশবপুরের মেহেরপুর গ্রামে ঘর বেঁধেছেন আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস হোগল ও বাঙালি নারী রহিমা খাতুন প্রেমের প্রায় একযুগ পার করে। তাঁরা বাস করছেন মুন্সি মেহেরুল্লার মাজারের পাশে। নিজেকে পুরোপুরি বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন ক্রিস হোগল। পরম মমতা নিয়ে কৃষিকাজ করেন। নিজেই জমিতে ধান কাটেন, বোঝা টেনে নিয়ে ধান তোলেন ভ্যানে। এই কায়িক শ্রমে ক্লান্ত হন না মার্কিন ইঞ্জিনিয়ার। কপোতাক্ষ নদের তীরে মেহেরপুর গ্রামে বিশাল বট গাছের কাছে রয়েছে মুন্সি মেহেরুল্লার মাজার। স্থানীয় আশরাদ আলি মোড়ল, যিনি ‘মোড়ল’ নামেই পরিচিত এলাকায়, তিনি জানালেন ক্রিসের কথা। আধো উচ্চারণে সালাম করেন বিদেশি শেতাঙ্গ। শরীরে ট্যাটু আঁকা মানুষটি বলেন, তাঁর নাম মো. আয়ূব। ইরেজিতে প্রশ্ন করা হলে অবশ্য তিনি নাম বলেন, ক্রিস হোগল।

বিবেক শিল্পী মোড়ল বলেন, বিদেশি মানুষটি বিয়ে করে অনেকদিন ধরে এখানে বসবাস করছেন। ক্রয় করেছেন প্রায় ১০-১২ বিঘা ফসলি জমি। ক্রিস হোগল ভ্যানে ওঠান ধান ক্ষেত থেকে ধান এনে। তারপর নিজের বাড়ির দিকে চলে যান ধানভর্তি ভ্যান ঠেলে। তিনি দু’একটি বাক্য বাংলায় বলতে পারেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে তাঁর বাড়ি, পেশায় পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার তিনি। মুম্বইতে তিনি পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন অনিল আম্বানির রিলায়েন্স ন্যাচারাল রিসোর্সেস লিমিটেড কোম্পানিতে। ঘটনাক্রমে মুম্বাই শহরেই রহিমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। রহিমা খাতুন জানান তাঁর জীবনের কাহিনী। তিনি বলেন, শৈশবে অভাবের তাড়নায় ভারতে পাড়ি জমান তাঁর বাবা আবুল খাঁ ও মা নেছারুন নেছার হাত ধরে।

রহিমা খাতুনের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে। বাবা শ্রমিকের কাজ করতেন। আর রহিমা বারাসাতের বস্তিতে একা থাকতেন সেই শৈশবে। বাবা তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন তেরো চৌদ্দ বছর বয়সে। সেখানে জমিও ক্রয় করেন। তখন তিন সন্তানের জননী রহিমা খাতুন। কিন্তু অভাবের তাড়নায় সেখানকার জমি বিক্রি করে দেন তাঁর প্রাক্তন স্বামী। তারপর নিরুদ্দেশ হয়ে যান রহিমা খাতুনকে একা ফেলে। জীবিকার সন্ধানে মুম্বাই শহরে চলে যান রহিমা খাতুন। পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তির বস্তির খুপরিতে শ্যামলা বর্ণের রহিমা খাতুন আশ্রয় নেন। রহিমা বলেন, হঠাৎ একদিন ক্রিস হোগলের সঙ্গে পরিচয় হয় সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের রাস্তায়। হোগল তাঁর পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁরা আবার দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন হিন্দিতে দু-এক লাইন কথা বলার পর। এভাবে ছয় মাস পর তাঁরা বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। বিয়ের তিন বছর পর কর্মসূত্রে ক্রিস হোগল চীনে যান স্ত্রী রহিমাকে নিয়ে। সেখানে ছিলেন পাঁচ বছর। এরপর তাঁরা ফিরে আসেন কেশবপুরের মেহেরপুরে রহিমা খাতুনের বাবার ভিটায়।

মেহেরপুরে ফিরে আসার পর মারা যান রহিমা খাতুনের বাবা আবুল খাঁ। তাঁকে কবর দেওয়া হয় বাড়ির উঠানের পাশে। তাঁরা বাবার কবর সংরক্ষণ করেন প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ করে মোজাইক পাথর দিয়ে। এখনও জীবিত রহিমার মা নেছারুন নেছা। তাঁদের সঙ্গেই থাকে রহিমার প্রথম স্বামীর তিনটি সন্তান। ক্রিস হোগলের শখ বই পড়া ও মোটর সাইকেলে দূরদূরান্তে ভ্রমণ। বর্তমানে তাঁরা সুখী একটি সুন্দর পরিবার পেয়ে। ক্রিস হোগল বলেন, মিশিগান খুব সুন্দর শহর। অনেক আগে তাঁর আমেরিকান স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তাঁর মা ও ছেলে-মেয়ে রয়েছেন সেখানে। আমেরিকা থেকে মা ও ছেলে-মেয়েকে এখানে নিয়ে আসবেন মেহেরপুরে বাড়ির কাজ শেষ হলে। ক্রিস বহুদেশ ঘুরেছেন। তবে তাঁকে বারংবার বিমোহিত করে বাংলার সবুজ প্রকৃতি, ধান ক্ষেত ও সরিষা ফুলের হলুদ রং। অনেক ভালো মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে এই দেশে। মেহেরপুরে আছেন একটানা ৪ বছর। বাংলার প্রকৃতিকে ভালোবেসে বাকি জীবনও এখানেই কাটাতে চান। পোশাক কারখানা সহ আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কাজ করতে চান এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য।